মিহিরুজ্জামান সাতক্ষীরাঃ
সাতক্ষীরায় এখন এক বালতি পানির দাম যেন তেলের চেয়েও দামি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ দিন ধরে পৌরসভার পাইপ লাইনে পানি সরবরাহ কার্যত বন্ধ। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় অকেজো হয়ে পড়েছে ব্যক্তিগত টিউবওয়েলগুলোও। খাবার পানি তো দূরের কথা,শৌচাগার ব্যবহারের পানি টুকু না পেয়ে ৯টি ওয়ার্ডের হাজার হাজার মানুষের জীবন এখন দুর্বিষহ। শহর জুড়ে চলছে পানির জন্য হাহাকার,অথচ পৌর কর্তৃপক্ষের ভূমিকা কেবল অজুহাত আর আশ্বাসএর মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
শহরের ইটাগাছা,কামাললনগর,রসুলপুর, মুনজিতপুর,দক্ষিণ কাটিয়া,লস্করপাড়া ও মাস্টারপাড়া ঘুরে দেখা গেছে এক করুণ চিত্র। গৃহিণীরা খালি কলস আর বালতি নিয়ে এ পাড়া ও পাড়া ছুটছেন। ১, ৩, ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের অবস্থা সবচেয়ে ভয়াবহ। কাটিয়া মাস্টার পাড়া এলাকার বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,কয়েক মাস ধরে তাঁরা ব্যবহারের পানি পাচ্ছেন না। গোসল ও শৌচাগারের কাজ সারাও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে ২০-৩০ টাকা দরে প্রতি ড্রাম পানি কিনে আনছেন।
সাতক্ষীরা পৌর এলাকায় সুপেয় পানির সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। দীর্ঘ দিন ধরে পাইপ লাইনে পানি সরবরাহ বন্ধ থাকা এবং ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডের হাজার হাজার মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। পানির জন্য এখন শহর জুড়ে চলছে হাহাকার। খাবার ও ব্যবহারের পানির জন্য সাতক্ষীরা শহরের মানুষ সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। সাতক্ষীরা শহরের ইটাগাছা এলাকার কয়েক জন বাসিন্দা জানান, তারা দীর্ঘ দিন ধরে খাবার ও ব্যবহারের পানির জন্য পানি পাচ্ছেন না। বিকল্প উপায়ে তাদের পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, সাতক্ষীরা পৌরসভা অভিভাবক শূণ্য হয়ে পড়েছে। সরকারি আমলা তন্ত্রের জালে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন সাতক্ষীরার শহরের মানুষ। সাতক্ষীরা শহরের কাটিয়া মাস্টারপাড়া এলাকার কয়েকজন জানান,কয়েক মাস ধরে তারা খাবার ও ব্যবহারের পানি পাচ্ছেন না। আগে মাঝে মধ্যে খাবার জন্য পানির সরবরাহ পাওয়া গেলেও বর্তমানে তাও মিলছে না। এতে করে গোসল,শৌচাগার সহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় কাজে পানি মিলছে না। শহরের কয়েকটি এলাকা ছাড়া অধিকাংশ এলাকায় পানির জন্য চলছে হাহাকার। বাড়িতে পয়োনিষ্কাশনের কাজ সারার মতো এমন পানিও পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেন অনেকেই। তীব্র গরমে স্থানীয় জলাশয় ও পুকুরগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় গোসল ও ধোয়া-মোছার কাজও করা যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে অনেক পরিবার দূর-দূরান্ত থেকে ভ্যানে করে ড্রাম ভর্তি পানি কিনে আনছেন। প্রতি ড্রাম পানি কিনতে খরচ হচ্ছে ২০ থেকে ৩০ টাকা।
সাতক্ষীরা নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে,প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে এই সংকট দেখা দিলেও স্থায়ী কোনো সমাধান করা হচ্ছে না। অবিলম্বে গভীর নলকূপ স্থাপন এবং আধুনিক পানি শোধনগার সক্রিয় করার জোর দাবি জানিয়েছেন তারা। সুলতানপুর এলাকার বাসিন্দা হালিমাতুজ সাদিয়া তিক্তকণ্ঠে বলেন, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শুধু পানির চিন্তায় থাকতে হয়। কল দিয়ে পানি আসে না, টিউবওয়েলের পানি মুখে তোলা যায় না। আমরা কি কর (ট্যাক্স) দেব শুধু কষ্ট পাওয়ার জন্য এ প্রশ্ন শুধু হালিমাতুজ সাদিয়ার নয়,এ প্রশ্ন হাজারো পৌরবাসির। সাতক্ষীরা নাগরিক কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব আলী নূর খান বলেন,শহরের অধিকাংশ পুকুর ভরাট করে অপরিকল্পিত আবাসন গড়ে তোলায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। মানুষ এখন বাধ্য হয়ে অস্বাস্থ্যকর উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করছে, যা বড় ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করছে। তিনি অভিযোগ করেন,প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে সংকট দেখা দিলেও স্থায়ী সমাধানের কোনো সদিচ্ছা নেই কর্তৃপক্ষের। পৌরসভার পানি সরবরাহ শাখার তথ্য বলছে,শহরে দৈনিক পানির চাহিদা ১ কোটি ৪০ লাখ লিটার। অথচ সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ৬০ লাখ লিটার যা চাহিদার অর্ধেকেরও কম। ১৮টি পাম্পের মধ্যে বেশ কয়েকটি দীর্ঘ দিন ধরে অকেজো পড়ে আছে। ওয়াটার সুপার ও সহকারী প্রকৌশলী নিমাই চন্দ্র বিশ্বাস সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে বলেন,ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় উৎপাদন কমেছে। ঈদের পরে অকেজো পাম্প গুলো মেরামতের টেন্ডার হয়েছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে দুটি নতুন মোটর স্থাপনের কাজ চলছে, তবে তা সময়সাপেক্ষ।
পৌরবাসীদের অভিযোগ,যান্ত্রিক ত্রুটি আর বিদ্যুৎ বিভ্রাটের পুরনো দোহাই দিয়ে দায় এড়াতে চায় কর্তৃপক্ষ। যখন তীব্র গরমে নাভিশ্বাস উঠছে জন জীবনে,তখন ঈদের পরে মেরামত হবে এমন আশ্বাসকে পরিহাস হিসেবেই দেখছেন ভুক্তভোগীরা। বিশেষ করে মেস ও ছাত্রা বাস গুলোতে থাকা শিক্ষার্থীরা পানির অভাবে রান্না ও গোসল করতে না পেরে শহর ছাড়ার উপক্রম হয়েছে। শহরবাসীর দাবি,টেন্ডার আর আমলা তান্ত্রিক জটিলতা সরিয়ে রেখে জরুরি ভিত্তিতে ভ্রাম্যমাণ ট্যাংকারের মাধ্যমে পানি সরবরাহ এবং গভীর নলকূপ সচল করা হোক। তা না হলে এই হাহাকার অচিরেই জন বিক্ষোভে রূপ নিতে পারে।
খবরে থাকুন, ফলো করুন আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ায়