মোক্তার আহমেদ :
বন্দর নগরী চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে পরিবেশ সংরক্ষণ ও মানবাধিকার সাংবাদিক ফাউন্ডেশন কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে এক জরুরি সভা কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সভায় প্রধান অতিথি মোক্তার আহমেদ বলেন বন্যাকবলিত এলাকার অসহায় মানুষ চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। মানবিক ও দায়িত্ববোধ থেকে তাদের পাশে দাঁড়ান প্রত্যেক সামর্থ্যবান মানুষের কর্তব্য। তাই দ্রুত ত্রাণ সামগ্রী সংগ্রহ করে বন্যাতদের মাঝে তা পৌঁছে দিতে সংগঠনের সকল সদস্য, নেতা কর্মী, সুধীজন এবং বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
টানা অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসের কারণে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় ১০ লাখেরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অন্তত ৫৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলা। সরকার ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা দুর্গতদের মাঝে ত্রাণ ও চিকিৎসাসামগ্রী বিতরণ করছে।
টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের ভয়াল থাবায় চ আজ এক গভীর মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি। উত্তাল নদ-নদীর পানি ও পাহাড়ি ঢলের স্রোতে তলিয়ে গেছে অসংখ্য বসতঘর, রাস্তাঘাট, সেতু, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিস্তীর্ণ কৃষিজমি। বহু পরিবারের গরু-ছাগলসহ গবাদিপশু মারা গেছে বা ভেসে গেছে। ঘরে ঢুকে পড়া পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে ধান, খাদ্যসামগ্রী, আসবাবপত্র, পোশাক ও বহু বছরের কষ্টার্জিত সঞ্চয়। এক নিমিষেই অনেক পরিবারের স্বপ্ন যেন পানির স্রোতে ভেসে গেছে।
বন্যার পানিতে আটকা পড়ে হাজার হাজার মানুষ দিনের পর দিন মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বিশুদ্ধ পানির সংকট, খাদ্যাভাব, ওষুধের অভাব এবং নিরাপদ আশ্রয়ের অনিশ্চয়তায় প্রতিটি মুহূর্ত তাদের কাছে এক কঠিন সংগ্রাম। ক্ষুধার্ত শিশুর কান্না, অসহায় বৃদ্ধের দীর্ঘশ্বাস, উদ্বিগ্ন মায়ের অশ্রুসিক্ত চোখ এবং কর্মহীন বাবার নীরব আর্তনাদ—সব মিলিয়ে বন্যাকবলিত জনপদ আজ এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সাক্ষী।
মারা যাওয়াদের মধ্যে ২৮ জনই কক্সবাজারের। জেলার পাহাড়গুলোতে বসবাসরত প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছেন এবং সেখানে পাহাড়ধসের ঘটনাও ঘটেছে।উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম: দুর্গত এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করতে সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর দল কাজ করে যাচ্ছে। সরকার ১ হাজার ১৩১টির বেশি আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছে, যেখানে ৪৪ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।
অনেক পরিবারের ঘরে আজ চুলা জ্বলছে না। কেউ আশ্রয় নিয়েছেন উঁচু সড়কে, কেউ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, আবার কেউ বা আশ্রয়কেন্দ্রে। তবুও তারা বেঁচে থাকার স্বপ্ন ছাড়েননি। তারা অপেক্ষা করছেন—কেউ একজন মানবতার হাত বাড়িয়ে দেবেন, কেউ একজন তাদের পাশে এসে দাঁড়াবেন।
এমন সংকটময় মুহূর্তে দেশের সব জেলার বিত্তবান ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, প্রবাসী, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সর্বস্তরের মানবিক মানুষের প্রতি বিনীত আহ্বান— বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ান। আপনার সামান্য আর্থিক সহায়তা, অল্প কিছু চাল, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ কিংবা প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী একটি অসহায় পরিবারের জন্য হতে পারে নতুন জীবনের আশার আলো।
আজ যারা বিপদে, তারা আমাদেরই ভাই-বোন, আমাদেরই স্বজন। তাদের কষ্ট শুধু তাদের নয়, এ কষ্ট আমাদের সবার। দুর্যোগ মানুষের পরিচয় নয়; মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার মানবিকতা, সহমর্মিতা এবং একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতায়।
মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য। এই চিরন্তন মানবিক বাণীকে হৃদয়ে ধারণ করে আসুন, আমরা সবাই বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াই। আমাদের সামান্য সহানুভূতি, আন্তরিক সহযোগিতা ও ভালোবাসাই পারে একটি অসহায় পরিবারের চোখের অশ্রু মুছে দিয়ে আবারও বাঁচার স্বপ্ন দেখাতে। মানবতার এই কঠিন পরীক্ষার সময়ে নীরব দর্শক নয়, বরং সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে প্রমাণ করি—মানুষ এখনও মানুষের সবচেয়ে বড় ভরসা।
খবরে থাকুন, ফলো করুন আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ায়