স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট : রাজধানী তুরাগের বাউনিয়া পাবনারটেক এলাকায় সড়ক উন্নয়নের নামে জোরপূর্বক চাঁদা আদায়, ঘরবাড়ি ভাঙচুর, জমি দখল, নির্মাণসহ সংঘবদ্ধ একটি প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। রাজনৈতিক পরিচয় বদলে সক্রিয় একটি গোষ্ঠী এসব কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিচ্ছে বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি। এর সঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) অঞ্চল-৬-এর কতিপয় কিছু অসাধু কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে। খবর একাধিক বিশ্বস্ত তথ্য সূত্রের।
স্থানীয় সূত্র জানায়, রাজধানী ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পশ্চিম পাশে তুরাগ থানার পাবনারটেক এলাকাটি দীর্ঘদিন যাবত অবহেলিত থাকলেও সম্প্রতি ডিএনসিসি সড়ক উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ দেয়। তবে কাজ শুরুর পর ‘উন্নয়ন কমিটি’ নামের একটি সংগঠন গঠন করে এলাকাবাসীর কাছ থেকে জোরপূর্বক চাঁদা আদায়ের নিত্যনতুন অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের আওয়ামীলীগ সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠ জৈনক মাহাতাব নামে এক ব্যক্তি এই কমিটির শীর্ষ নেতৃত্বে রয়েছে। এছাড়া তার সহযোগী হিসেবে রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, ফরিদ উদ্দিন, মনির হোসেন জসীম, হক হাওলাদার, মুস্তাকিন, রইছ এবং মাহাতাবের ছেলে প্রিন্সসহ আরও কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি এতে সক্রিয় ভাবে জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে ।
স্থানীয় এলাকাবাসি ও ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিটি পরিবার কিংবা বাড়ির মালিকের কাছ থেকে ৫ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে বুলডোজার দিয়ে বাড়ির অংশ বিশেষ ভেঙে ফেলার ঘটনাও ঘটেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা লুৎফুন নাহার এ প্রতিবেদককে অভিযোগ করে বলেন, তার কাছে ১৫ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। কাঙ্কিত টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে তার পাঁচতলা ভবনের গেটের চ্যানেল, পয়ঃনিষ্কাশন পাইপসহ সামনের অংশ ভেঙে ফেলা হয়। এতে করে প্রায় ২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে তার। তার অভিযোগ, কথিত উন্নয়ন কমিটির সভাপতি রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরীর নেতৃত্বেই এ ঘটনা ঘটে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক ভুক্তভোগী নারী এ প্রতিবেদককে জানান, অসুস্থ সন্তানের চিকিৎসা ব্যয়ের মধ্যেও তার কাছ থেকে ৩ হাজার টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে না পারায় তার বসতঘরের একাংশ ভেঙে জমি দখল করা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সোয়া দুই শতাংশ জমির মধ্যে সোয়া এক শতাংশই রাস্তার নামে নিয়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে জমি কম নেওয়া হলেও দরিদ্র ও অসহায় মানুষের ক্ষেত্রেই বেশি দখল করা হচ্ছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, ফরিদ, জসীম ও রইছ তার কাছে চাঁদা দাবি করেন এবং ঘর ভাঙার ঘটনায় মুস্তাকিন প্রধান ভূমিকা পালন করেন। ওই নারী (তিনি) আরও জানান, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি’)তে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তিনি তার শেষ সম্বলটুকু রক্ষা করতে পারেননি। পরবর্তীতে ডিএনসিসি অঞ্চল-৬-এর সড়ক পরিদর্শক ফারুক প্রথমে সহযোগিতার আশ্বাস দিলেও পরে মামলা- মোকদ্দমায় না জড়াতে পরামর্শ দেন এবং আর কোনো সাড়া দেননি। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে সড়ক পরিদর্শক ফারুক সাংবাদিকদের বলেন, “যার যার বাড়ি, সে নিজেই ভাঙছে—অন্য কেউ ভাঙেনি।”
অন্যদিকে স্থানীয় বাসিন্দা ভুক্তভোগী স্বপ্না আক্তার অভিযোগ করে গণমাধ্যমকে বলেন, তার বাড়ি ভাঙচুরের সময় তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার চেষ্টা করা হয়। তার দাবি, রাস্তার পাশে খালি জমি থাকা সত্ত্বেও দরিদ্র মানুষের বাড়িঘর লক্ষ্য করেই দখল কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এদিকে জমি দখলের অভিযোগে আমেনা খাতুন হাইকোর্টে রিট আবেদন করলে ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর আদালত ৬০ দিনের মধ্যে বিষয়টি নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন। কিন্তু স্থানীয়দের দাবি, আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে অল্প সময়ের মধ্যেই রাতের আঁধারে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে রাস্তার একাংশের কাজ রাতারাতি সম্পন্ন করা হয়। এলাকাবাসী (তাদের) অভিযোগ, নির্ধারিত মানের তুলনায় কম রড, সিমেন্ট ও বালু ব্যবহার করা হয়েছে, যা সড়কের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এছাড়া রাতের অন্ধকারে কাজ চলাকালে ডিএনসিসি অঞ্চল-৬-এর নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন উর রশিদের উপস্থিতির অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ প্রসঙ্গে উন্নয়ন কমিটির সভাপতি রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, “সিটি করপোরেশন প্রথমে কাজ না করার সিদ্ধান্ত নিলে ১৪ লাখ টাকার প্রস্তাব দিয়ে কাজ শুরু করানো হয়েছে।” অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক ফরিদ উদ্দিন দাবি করেন, “এলাকাবাসীর সম্মতিতেই উন্নয়নের জন্য টাকা তোলা হয়েছে।”
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দা জানান, চাঁদার একটি অংশ ঘুষ হিসেবে ব্যবহার করে সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলীসহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করা হয়েছে। ফলে তারা চাঁদাবাজ কমিটির পক্ষেই কথা বলছেন। এ বিষয়ে প্রতিবাদ করলে উল্টো ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগও রয়েছে।
এ বিষয়ে ডিএনসিসি অঞ্চল-৬-এর নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন উর রশিদের সঙ্গে পরবর্তীতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার অফিসে গিয়েও তাকে অনুপস্থিত পাওয়া গেছে। মোবাইল ফোনে কল ও হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠালেও তিনি সাড়া দেননি।
বর্তমানে উন্নয়নের নামে চাঁদাবাজি, ভাঙচুর, জমি দখল, হামলা-মামলা, ঘুষ বাণিজ্য ও নির্মাণে অনিয়ম—এসব অভিযোগে তুরাগ থানার পাবনারটেক এলাকায় চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। স্থানীয় সচেতন মহল দ্রুত সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে। এব্যাপারে বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী, গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী, চেয়ারম্যান, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), প্রশাসক, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি)সহ সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসী।