কে.এম. হাছান:
চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ কলেজ রোড এলাকার বাতাসে এখন শুধুই শোক আর রহস্যের গন্ধ। আপাতদৃষ্টিতে একটি সাধারণ মৃত্যুর ঘটনা মনে হলেও, এর ভেতরের অসঙ্গতিগুলো জন্ম দিচ্ছে অজস্র প্রশ্নের।
দিনদুপুরে নিখোঁজ হওয়া এক যুবকের নিথর দেহ রাতে মিলল এক পরিত্যক্ত ডোবায়। স্বজনদের দাবি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, অথচ ঘটনাস্থলের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। এই দুইয়ের মেলবন্ধনে মেকানিক ইব্রাহিমের মৃত্যু এখন ফরিদগঞ্জে টক অব দ্য টাউনে পরিণত হয়েছে। দিনের আলোয় নিখোঁজ, রাতে নির্জন ডোবায় সন্ধান অনুসন্ধানে জানা যায়, নিহত ইব্রাহিম হাওলাদার পটুয়াখালী জেলার বাউফল থানার স্থায়ী বাসিন্দা নয়ন হাওলাদারের ছেলে। তবে তারা দীর্ঘদিন ধরে ফরিদগঞ্জ কলেজ রোড এলাকায় সপরিবারে বসবাস করে আসছিলেন। ইব্রাহিম ও তার বড় ভাই লিটন হাওলাদার যৌথভাবে স্থানীয় একটি অটোরিকশা গ্যারেজ পরিচালনা করতেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ৯আগস্ট রবিবার সকাল ৯টায় প্রতিদিনের মতোই দোকানে এসেছিলেন ইব্রাহিম। কিন্তু সকাল ১১টার দিকে বড় ভাই লিটন দোকানে গিয়ে ইব্রাহিমকে আর পাননি। দিনের আলোতেই উধাও হয়ে যান তিনি। সারাদিন চারদিকে খোঁজাখুঁজি, এমনকী ইব্রাহিমের বন্ধু ইমনের কাছে সন্ধান নিয়েও কোনো হদিস মেলেনি। অবশেষে রাত আনুমানিক ৮টার দিকে রাজা-বাজারের পেছনে সাধারণ মানুষের চলাচলহীন, আবর্জনার স্তূপ ও পরিত্যক্ত একটি ডোবা থেকে ইব্রাহিমের কাদা-মাখা লাশ উদ্ধার করে তার পরিবার। স্বজনদের দাবি বনাম বাস্তবতার অমিল ইব্রাহিমের ডান হাতে একটি ক্ষতস্থান দেখে প্রাথমিকভাবে পরিবারের ধারণা—বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে।
ঘটনাস্থল বিশ্লেষণ করলে বেশ কিছু গুরুতর প্রশ্ন সামনে আসে: যে পরিত্যক্ত ডোবা থেকে লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, তার আশেপাশে বা অকুস্থলে কোনো ধরনের বিদ্যুতের সংযোগ বা ছেঁড়া তার ছিল না। তবে জনমানবহীন এই ডোবায় কীভাবে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ঘটনা ঘটল?
সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ইব্রাহিম কোথায় ছিলেন? তিনি নিজে কেন এই নির্জন ও আবর্জনার স্তূপে যাবেন? স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, লাশ উদ্ধারের স্থান এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি কোনো স্বাভাবিক দুর্ঘটনার ইঙ্গিত দেয় না। ফলে এলাকায় তীব্র অসন্তোষ ও গুঞ্জন দানা বাঁধছে।
আইনি প্রক্রিয়ার আগেই লাশ বাড়িতে: ধোঁয়াশা আরও ঘনীভূত এই ঘটনার সবচেয়ে রহস্যজনক দিকটি উন্মোচিত হয় লাশ উদ্ধারের ঠিক পরপরই।
যেকোনো অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে প্রথম আইনি পদক্ষেপ হলো পুলিশকে জানানো এবং সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করা। কিন্তু ইব্রাহিমের পরিবার কোনো আইনি প্রক্রিয়া বা পুলিশকে না জানিয়েই লাশ উদ্ধার করে সরাসরি কলেজ গেট এলাকার বাসায় নিয়ে আসে। লাশ উদ্ধারের পর কেন কোনো হাসপাতালে নেওয়া হলো না—এমন প্রশ্নের জবাবে ইব্রাহিমের সৎ মা নয়ন তারা অকপটে বলেন, “না, আমরা হাসপাতালে না নিয়ে সরাসরি বাসায় নিয়ে আসছি।
”একটি তরতাজা যুবকের মৃত্যুর পর পরিবারের এই তাড়াহুড়ো এবং আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা ধোঁয়াশাকে আরও ঘনীভূত করেছে।” এটি কি কেবলই অজ্ঞতা, নাকি এর পেছনে রয়েছে কোনো অদৃশ্য চাপ বা সত্য গোপনের চেষ্টা? তদন্তের দাবি স্থানীয়দের ঘটনার পর থেকে এলাকায় নানা গুঞ্জন বইছে।
স্থানীয়দের দাবি, ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। এটি কেবলই একটি দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে কোনো সুপরিকল্পিত অপরাধ বা হত্যাকাণ্ড লুকিয়ে আছে—তা ময়নাতদন্ত এবং পুলিশের নিখুঁত তদন্ত ছাড়া স্পষ্ট হওয়া সম্ভব নয়। ইব্রাহিমের মৃত্যুর আসল সত্য জানতে এখন স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপের অপেক্ষায় ফরিদগঞ্জ বাসী।
এ বিষয়ে অফিসার ইনচার্জ ফরিদগঞ্জ মোহাম্মদ এরশাদ উল্লা জানান ঘটনাস্থলে আমাদের টিম গিয়েছে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।