মনির হোসেন জীবন,
স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
: রাজধানীর অদূরে ঢাকা জেলার আশুলিয়ায় নির্মাণাধীন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের পিলারের পাশ থেকে অটোভ্যান চালক মো. সুজন হাওলাদারের (২৯) গলাকাটা মরদেহ উদ্ধারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ঢাকা জেলা।
এঘটনায় হত্যাকান্ডের সাথে সরাসরি জড়িত গ্রেফতারকৃত আসামি মোঃ মারুফ (৩৯) এবং লুণ্ঠিত ভ্যান কেনায় অভিযুক্ত মোঃ তানভীর ঢালী ওরফে আকাশ (২২)কে মাদারীপুর সদর থানা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে। পরে তাদের নিকট থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত চাপাতি, নিহতের অটোভ্যান ও মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তার দুই জনই আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন ।
পিবিআই পুলিশ জানিয়েছে, নিহত সুজন হাওলাদার পটুয়াখালী সদরের লোহালিয়া ইউনিয়নের কুড়িপাইকা গ্রামের মোঃ আমির হাওলাদারের ছেলে। তিনি পরিবার নিয়ে কেরানীগঞ্জের আগানগর এলাকায় ভাড়া থাকতেন। ভ্যান মেরামতের কথা বলে ওয়ান-টাইম বন্ধু সেজে ডেকে এনে আশুলিয়ায় অটোভ্যান চালক সুজন হাওলাদারকে (২৯) নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। পরবর্তীতে নিহতের লাশ ফেলে ১০ হাজার টাকায় ভ্যানটি বিক্রি করে দেওয়া হয়।
আজ বৃহস্পতিবার (১৩ আগষ্ট, ২০২৬) দুপুর সাড়ে ১২টায় রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানার উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টর, হাউজ -৩৫, রোড নং-১৪, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ঢাকা জেলা কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) এম, এন, মোর্শেদ, পিপিএম এসব তথ্য জানান।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ঢাকা জেলার তদন্ত তদারকী কর্মকর্তা এম, এন, মোর্শেদ, (পিপিএম), তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক (নিঃ) মোঃ জামাল উদ্দীন, (বিপিএম)সহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এসময় উপস্থিত ছিলেন।
ঘটনার বিবরণ উল্লেখ করে পিবিআই পুলিশের এসপি সাংবাদিকদের বলেন, কেরানীগঞ্জের বাসিন্দা সুজন হাওলাদার চলতি বছরের গত ৮ আগস্ট বিকেল আনুমানিক ৫টার দিকে অটোভ্যান নিয়ে বাসা থেকে বের হন। ঘটনার দিন রাত আনুমানিক ৯টার দিকে নিজ স্ত্রীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে শেষবারের মতো কথা বলেন তিনি। এরপর থেকে তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরদিন ১০ আগস্ট সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আশুলিয়া থেকে আবদুল্লাহপুর গামী সড়কের পাশে নির্মাণাধীন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ৮১/১ ও ৮১/২ নম্বর পিলারের মাঝামাঝি স্থান থেকে সুজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ওই সময় তার মাথায় থেঁতলানো আঘাত এবং গলায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন ছিল। খবর পেয়ে নিহতের মা মোছাম্মদ আলো বেগম ও স্ত্রী ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ শনাক্ত করেন। পরে আশুলিয়া থানা পুলিশ সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠায়। এ ঘটনায় নিহতের মা বাদী হয়ে গত ১১ আগষ্ট, ২০২৬ তারিখে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে আশুলিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। যার নম্বর ৫৮; পেনাল কোডের ৩০২/২০১/৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। পরে পিবিআই ঢাকা জেলা স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে। পুলিশ পরিদর্শক (নিঃ) মো. জামাল উদ্দীন, বিপিএমকে মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. মোস্তফা কামালের সার্বিক দিকনির্দেশনায় এবং পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম. এন. মোর্শেদ, পিপিএমের তত্ত্বাবধানে তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান শুরু করে পিবিআই।
পিবিআই জানায়, এরই ধারাবাহিকতায় গত ১১ আগস্ট, ২০২৬ আনুমানিক সকাল সাড়ে ৮টার দিকে মাদারীপুর সদর থানার আনসার ক্যাম্পসংলগ্ন একটি অটো গ্যারেজে অভিযান চালিয়ে মারুফ ও তানভীর ঢালি ওরফে আকাশকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে নিহত সুজনের লুণ্ঠিত অটোভ্যান উদ্ধার করা হয়। মারুফের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় সুজনের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন। পরে মারুফের দেখানো মতে ঘটনাস্থলসংলগ্ন এলাকা থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত চাপাতিও উদ্ধার করা হয়।প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মারুফ হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। অপরদিকে তানভীর ঢালি ওরফে আকাশ মারুফের কাছ থেকে ৯০ হাজার টাকায় অটোভ্যানটি কেনার কথা স্বীকার করেন।
তদন্ত ও আসামিদের জবানবন্দির বরাত দিয়ে পিবিআই পুলিশ জানায়, মারুফ পেশায় ভ্যানচালক এবং নিহত সুজনের পূর্বপরিচিত। ৮ আগস্ট রাতে তারা মোহাম্মদপুরে একসঙ্গে দেখা করেন। পরে সুজনের অটোভ্যান নিয়ে তারা গাজীপুরের কাশিমপুরে যান। সেখানে মালামাল বোঝাই করে লালবাগের উদ্দেশে রওনা হন তারা। ভোরের দিকে আশুলিয়া ব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে অটোভ্যানটি বিকল হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় চেষ্টা করেও সেটি ঠিক করতে না পেরে তারা নির্মাণাধীন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিচে অবস্থান নেন। সেখানে তারা ইয়াবা সেবন করেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম. এন. মোর্শেদ সাংবাদিকদের বলেন, ইয়াবা সেবনের পর সুজন ঘুমিয়ে পড়লে মারুফ অটোভ্যানে থাকা একটি চাপাতি নিয়ে আসেন। পরে ৯ আগস্ট আনুমানিক রাত আনুমানিক সাড়ে ১২টার দিকে প্রথমে একটি পাথর দিয়ে সুজনের মাথায় আঘাত করেন। এরপর চাপাতি দিয়ে তার গলায় কোপ দিয়ে হত্যা করেন।
সিবিআই পুলিশের এ কর্মকর্তা আরও বলেন, চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের সংবাদ পাওয়ার পরপরই পিবিআইয়ের একটি বিশেষ টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিহতের পরিচয় শনাক্ত করা হয় এবং ছায়া তদন্ত শুরু করা হয়। নিরলস তদন্তের মাধ্যমে আমরা ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত আসামিদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছি।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পিবিআই জানান, মামলাটির তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত আছে কি না, সেটিও গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।