বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৫০ পূর্বাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ :
মিথ্যা বিজ্ঞাপন ও অনিয়মে খুলনায় ৯ প্রতিষ্ঠানকে ৫৫ হাজার টাকা জরিমানা টঙ্গীতে স্টেশন রোড সড়ক দখলমুক্ত ও যানজট নিরসনে উচ্ছেদ অভিযান । যাত্রাবাড়ী থানার দনিয়া থেকে প্রাইভেটকার জব্দ ফরিদপুরের ভাঙ্গায় মহাসড়কে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণের ঘটনায় নারীসহ গ্রেফতার-২ ‎বেনাপোল সীমান্তে বিজিবির অভিযানে প্রায় ৩ লাখ টাকার চোরাচালানি পণ্য আটক উত্তরায় লিবার্টি ক্লাবে র‌্যাবের অভিযান – বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি মদ- বিয়ারসহ গ্রেফতার-২ গাজীপুরের টঙ্গীতে পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে পরোয়ানাভুক্ত আসামি ছিনতাইয়ের চেষ্টা গ্রেপ্তার ৫ কাশিয়ানীতে ৩২ লাখ টাকার স্বর্ণালংকার আত্মসাতের অভিযোগ বেনাপোল সীমান্তে ৪৯ বিজিবির অভিযান, মদ-সিরাপসহ বিপুল পণ্য আটক ‎যশোর সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ১৬ লাখ টাকার মাদক ও চোরাচালানি পণ্য আটক ‎ ইয়াবায় ভাসছে তুরাগের ৩৩টি গ্রাম, ১০১ স্পটে শতাধিক ডিলার সক্রিয়

সড়ক-ফুটপাতে চাঁদাবাজির দখল: হকার নয়, ধরতে হবে মূল হোতাদের

Reporter Name / ৬২ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

: মোঃ জহিরুল ইসলাম হামিদ—
বাংলাদেশের সড়ক ও ফুটপাত সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য। কিন্তু বাস্তব চিত্র যেন তার সম্পূর্ণ বিপরীত। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন শহর ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ফুটপাত এখন অনেক ক্ষেত্রেই দখল হয়ে আছে অস্থায়ী দোকান, ভ্যান, হকার ও নানা ধরনের ব্যবসায়িক স্থাপনায়। এতে পথচারীরা ফুটপাত ব্যবহার করতে পারছেন না; বাধ্য হয়ে তাদের নামতে হচ্ছে মূল সড়কে। ফলে বাড়ছে যানজট, দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও জনদুর্ভোগ।
তবে এই পুরো ব্যবস্থার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক শুধু ফুটপাত দখল নয়—এর আড়ালে গড়ে ওঠা চাঁদাবাজির অঘোষিত অর্থনীতি।
বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও অনুসন্ধানে ফুটপাত, সড়কের পাশে বসা দোকান এবং বিভিন্ন ধরনের যানবাহন থেকে নিয়মিত টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠে এসেছে। কোথাও দৈনিক ভিত্তিতে, কোথাও মাসিক ভিত্তিতে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অনেক হকারের ভাষ্য, নির্দিষ্ট টাকা না দিলে তাদের দোকান বা বসার জায়গা হারানোর ভয় থাকে।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন—হকার আর চাঁদাবাজ এক নয়।
একজন হকার হয়তো জীবিকার তাগিদে রাস্তায় বসেছেন। তাঁর পুঁজি সীমিত, কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। কিন্তু তাঁর কাছ থেকে ভয় দেখিয়ে, প্রভাব খাটিয়ে কিংবা অবৈধভাবে টাকা আদায় করা নিঃসন্দেহে ভিন্ন একটি অপরাধ। তাই ফুটপাতের সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে শুধু হকারদের উচ্ছেদ করলে মূল সমস্যাটি থেকে যাবে আড়ালেই।
বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—হকারদের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছে কারা? সেই টাকা কোথায় যাচ্ছে? কারা এই অবৈধ ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করছে?
কারণ, একটি ফুটপাত দখল করে যদি কয়েকজন মানুষ ব্যবসা করেন, সেটি হয়তো নগর ব্যবস্থাপনার সমস্যা। কিন্তু সেই জায়গায় বসার জন্য যদি নিয়মিত টাকা দিতে হয় এবং সেই টাকা কোনো সংঘবদ্ধ চক্রের হাতে যায়, তাহলে সেটি আর শুধু দখলের বিষয় থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে চাঁদাবাজির একটি সুসংগঠিত কাঠামো।
শুধু ফুটপাত নয়, দেশের বিভিন্ন সড়কে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, পার্কিং, স্ট্যান্ড কিংবা তথাকথিত ‘লাইন’ পরিচালনার নামেও টাকা আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সিএনজি, অটোরিকশা, বাস, ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনের চালকদের কাছ থেকে নানা অজুহাতে টাকা নেওয়ার অভিযোগও নতুন নয়।
একজন চালক দিনের শুরুতেই যদি বিভিন্ন স্থানে অবৈধ টাকা দিতে বাধ্য হন, তাহলে সেই অর্থ শেষ পর্যন্ত কোথা থেকে আসবে?
এর উত্তর খুব সহজ—এর চাপ গিয়ে পড়ে সাধারণ যাত্রী ও ভোক্তার ওপর।
পরিবহন খাতে অতিরিক্ত খরচ হলে ভাড়া বাড়ে। বাজারে পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়লে পণ্যের দাম বাড়ে। আর ফুটপাতের ব্যবসায়ীর কাছ থেকে চাঁদা নেওয়া হলে সেই খরচও কোনো না কোনোভাবে পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হয়। অর্থাৎ চাঁদাবাজির টাকা শেষ পর্যন্ত জনগণের পকেট থেকেই বেরিয়ে যায়।
এটি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার।
একজন পথচারী ফুটপাত দিয়ে নিরাপদে হাঁটতে পারবেন—এটি তাঁর অধিকার। কিন্তু ফুটপাত দখল হয়ে গেলে তাঁকে সড়কে হাঁটতে হয়। দ্রুতগতির যানবাহনের পাশে হাঁটতে গিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ঝুঁকির মধ্যে পড়েন। কোথাও কোথাও ফুটপাত দখলের কারণে পুরো সড়ক ব্যবস্থাই অচল হয়ে পড়ে।
তাহলে সমাধান কোথায়?
সমাধান শুধু উচ্ছেদ অভিযানে নয়। প্রথমে চিহ্নিত করতে হবে চাঁদাবাজির মূল হোতাদের।
কে টাকা তুলছে, কার নির্দেশে তুলছে, কারা এর পেছনে রয়েছে এবং সংগৃহীত টাকা কোথায় যাচ্ছে—এসব বিষয়ে কার্যকর তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে হকারদের জন্য বাস্তবসম্মত পুনর্বাসন ও বৈধ ব্যবসার সুযোগ তৈরি করতে হবে। কারণ শুধু উচ্ছেদ করে একজন দরিদ্র মানুষের জীবিকার পথ বন্ধ করে দিলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। আবার জনসাধারণের চলাচলের জায়গাও অনির্দিষ্টকাল দখল করে রাখার সুযোগ দেওয়া যায় না।
প্রয়োজন একটি সুশৃঙ্খল ও মানবিক নগর ব্যবস্থাপনা।
যেখানে ফুটপাত থাকবে পথচারীর জন্য, সড়ক থাকবে যানবাহনের জন্য এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য থাকবে নির্দিষ্ট ও বৈধ স্থান।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। বছরের পর বছর কোনো এলাকায় ফুটপাত দখল, অবৈধ স্ট্যান্ড কিংবা চাঁদাবাজি চলতে থাকলে প্রশ্ন উঠবেই—দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ কি বিষয়টি জানে না? আর জানলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন?
একটি রাষ্ট্রে আইন সবার জন্য সমান হওয়া উচিত। রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাব, অর্থ কিংবা কোনো গোষ্ঠীর ক্ষমতার কারণে যদি কেউ আইনের ঊর্ধ্বে চলে যায়, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা দুর্বল হয়।
তাই এখন সময় এসেছে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার।
তবে সেই ব্যবস্থা যেন শুধু নিম্নবিত্ত হকারের বিরুদ্ধে না হয়। হকারের পেছনে থাকা চাঁদাবাজ, দখলদার ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটকেও আইনের আওতায় আনতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে—একজন হকার হয়তো পেটের দায়ে ফুটপাতে বসেছেন; কিন্তু একজন চাঁদাবাজ অন্যের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে নিজের অবৈধ আয় তৈরি করছেন। দুজনকে একই চোখে দেখলে প্রকৃত অপরাধী আড়ালেই থেকে যাবে।
সড়ক ও ফুটপাত কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এগুলো জনগণের সম্পদ। জনগণের চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও প্রশাসনের দায়িত্ব।
তাই এখন প্রয়োজন শুধু ফুটপাত পরিষ্কার করা নয়—ফুটপাত ও সড়কের আড়ালে গড়ে ওঠা চাঁদাবাজির অদৃশ্য সাম্রাজ্য ভেঙে দেওয়া।
চাঁদাবাজমুক্ত সড়ক মানে শুধু যানজটমুক্ত সড়ক নয়। এটি একটি নিরাপদ নগর, স্বাভাবিক অর্থনীতি এবং আইনের শাসনের প্রতীক।
হকারকে উচ্ছেদ করে নয়, চাঁদাবাজির মূল শিকড় উপড়ে ফেলেই গড়ে উঠুক জনবান্ধব বাংলাদেশ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Theme Created By ThemesDealer.Com