মিহিরুজ্জামান সাতক্ষীরাঃ
সাতক্ষীরার কলারোয়ার সোনাবাড়িয়া শ্যাম সুন্দর মঠ মন্দিরের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে মধ্যযুগীয় পুরাকীর্তির ধুলোবালি মাখা ইতিহাস। ছাদ প্রান্ত ধনুকের মতো বাঁকা, কোণগুলো কৌণিক,আর দেয়াল জুড়ে টেরাকোটার প্রাচীন কারু কাজ। দূর থেকে দেখলে মনে হয় কোনো এক রাজকীয় পিরামিড দাঁড়িয়ে আছে। এটি সাতক্ষীরা সদর থেকে ২৬ কিলোমিটার দূরে,কলারোয়া উপজেলার সীমান্ত ঘেঁষা সোনাবাড়িয়া গ্রামের ঐতিহাসিক শ্যামসুন্দর মঠ মন্দির। প্রায় ৪০০ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই পুরাকীর্তিটি আজ চরম অযত্নে অবহেলা আর সংস্কারের অভাবে ধ্বংসের মুখে পড়েছে। অথচ সরকারি সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ পেলে এটি হতে পারত দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের অন্য তম আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র। ইতিহাসবিদ সতীশ চন্দ্র মিত্র এবং প্রফেসর মো.আবু নসরের বইয়ের তথ্য মতে, ১৭৬৭ খ্রিষ্টাব্দে জনৈক হরিরাম দাশ মতান্তরে দুর্গাপ্রিয় দাশ এই নবরত্ন মন্দিরটি নির্মাণ করেন। প্রায় ৬০ ফুট উঁচু তিন তলা বিশিষ্ট এই মূল মন্দিরের সঙ্গে রয়েছে একটি দুর্গা মন্দির ও একটি শিব অন্নপূর্ণা মন্দির। মন্দিরের ঠিক সামনেই রয়েছে জমির বিশ্বাসের পুকুর নামে একটি ঐতিহাসিক দীঘি।
স্থানীয় প্রবীণরা জানান,এক সময় এই মন্দিরের দোতলায় ছিল স্বর্ণের রাধা কৃষ্ণ মূর্তি এবং পূর্ব দিকে ছিল কষ্টি পাথরের তৈরি ১২টি শিব লিঙ্গ। লোকশ্রুতি রয়েছে,ভারতের বিখ্যাত রানী রাসমণি এবং শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবও এক সময় এই মন্দিরে এসে অবস্থান ও পূজা অর্চনা করেছিলেন। কালের বিবর্তনে মন্দিরটির জাঁকজমক আজ শুধুই অতীত। দেশ স্বাধীনের পর একে একে চুরি হয়ে গেছে কষ্টি পাথরের মূল্যবান শিব লিঙ্গ এবং স্বর্ণের মূর্তি গুলো। বর্তমানে মন্দিরটির দেয়াল খসে পড়ছে, আগাছা আর পরগাছায় ঢেকে গেছে এর কার্নিশ। মন্দিরের সেবাইত সুব প্রসাদ চৌধুরী আক্ষেপ করে বলেন,আমাদের পূর্ব পুরুষেরা এখানে পূজা দিয়ে আসছেন। এখনো চৈত্র সংক্রান্তি বা দুর্গা পূজায় আমরা কষ্ট করে আয়োজন করি। কিন্তু ভবনের যে ভঙ্গুর দশা, যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
মন্দিরের সভাপতি দেব প্রিয় চৌধুরী জানান,সংস্কারের অভাবের পাশা পাশি এখানে এখন মাদক সেবীদের উপদ্রব বেড়েছে। বাহিরের বখাটে লোকজন এসে অসামাজিক কার্যকলাপ করে প্রতিবাদ করতে গেলে উল্টো হুমকি শুনতে হয়। এই প্রাচীন ঐতিহ্য রক্ষায় গত কয়েক বছরে পরিদর্শনের কমতি ছিল না। ২০১৪ সালে ভারতের তৎকালীন ডেপুটি হাইকমিশনার সন্দীপ চক্রবর্তী,২০২২ সালে সহকারী হাইকমিশনার রাজেশ কুমার রায়না এবং হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের সচিব ডা. দীলিপ কুমার ঘোষ সহ জাহাঙ্গীরনগর ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল মন্দিরটি পরিদর্শন করেছেন। প্রত্যেকেই দ্রুত সংরক্ষণের আশ্বাস দিলেও,বাস্তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
এ বিষয়ে খুলনা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক মো.মহিদুল ইসলাম জানান,এটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের গেজেট ভুক্ত একটি মন্দির। আগে মন্দিরটি শুধু ধর্মীয় উপসানলয় ছিলো এখন ধর্মীয় উপসানলয়ের পাশা পাশি এখানে স্থানীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতি,সামাজিক জীবন ধারনের একটি অংশ। স্থাপনায় পোড়া মাটির অলংকরণ,ইটের নির্মাণ কৌশল, ফিনল্যান্ড এবং অলংকার ধরনের নকশা এ ধরনের মন্দির স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য বহন করে। এসব অলংকরনের ধর্মীয় কাহিনী,ফুল লতা পাতা জ্যামিতিক নকশা শিল্পনীতির প্রতি ফলন পাওয়া যায়। এটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আমরা রয়েছি। সামনের অর্থ বছরে আমরা বরাদ্দ নিয়ে সংস্কার সংরক্ষণের জন্য কাজ করব। মন্দিরের এই ভঙ্গুর দশা আর থাকবে না। শত বছরের ইতিহাস ও সংস্কৃতির সাক্ষী এই শ্যাম সুন্দর মঠটি কোনো রকমে টিকে আছে ভাঙা দেয়াল আর স্মৃতির ওপর ভর করে। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ যদি এখনই এর দায়িত্ব না নেয়, তবে হয়তো আগামী প্রজন্মের কাছে এই নবরত্ন মন্দিরের অস্তিত্ব কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীদের একটাই দাবি কাগজে কলমে আশ্বাস নয়, দ্রুত দৃশ্যমান উদ্যোগে বাঁচিয়ে তোলা হোক এই প্রাচীন প্রাণ স্পন্দনকে।