মিহিরুজ্জামান সাতক্ষীরাঃ
বর্ষা এলেই সাতক্ষীরা সদর উপজেলার মানুষের কাছে জীবন হয়ে ওঠে এক অনিবার্য দুঃস্বপ্ন। গত কয়েক বছর ধরে এটি আর কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়,বরং স্থায়ী এক অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বছরের চার থেকে ছয় মাস এখানকার বসতবাড়ি ও রাস্তা ঘাট ডুবে থাকে পলি-কাদাময় নোংরা পানিতে। শত কোটি টাকার প্রকল্প এলেও সাতক্ষীরা বাসীর ভাগ্যের চাকা ঘোরেনি বরং ফি-বছর বাড়ছে ক্ষোভ আর দীর্ঘ শ্বাস। সাতক্ষীরা পৌরসভার রাজার বাগান, মুন্সীপাড়া,কাটিয়া ও সুলতানপুর সহ নিচু এলাকা গুলোর অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়। এছাড়া লাবসা,বিনেরপোতা,বল্লী,ঝাউডাঙ্গা ও ব্রহ্মরাজপুরের বিস্তীর্ণ জনপদ প্রতি বর্ষায় জলমগ্ন হয়ে পড়ে। ঘর বন্দী মানুষের দুর্ভোগের সীমা থাকে না। রান্না ঘরে পানি, উঠানে পানি এমনকি গবাদি পশু রাখার জায়গাটুকুও থাকে না। সুপেয় পানির সংকট আর পানি বাহিত রোগের প্রাদুর্ভাবে জন জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। লাবসার বিনেরপোতা এলাকার বাসিন্দা সানজিদা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,প্রতি বছর বর্ষায় হাঁটু থেকে কোমর পানিতে থাকতে হয়। ছেলে মেয়েরা স্কুলে যেতে পারে না। মাছের ঘের তলিয়ে সব শেষ হয়ে যায়। এই কষ্ট বলে বোঝানোর মতো না। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে মাত্র ৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই পৌর এলাকা ডুবে গিয়েছিল। এর পর সেপ্টেম্বরে ২৫৬ মি.লি মিটার ভারী বর্ষণে বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয় একের পর এক গ্রাম। ২০২৫ সালেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন,এই দুর্যোগের মূল কারণ নদী ও খালের অবৈধ দখল এবং পলি ভরাট। এক সময় যে সব শাখা খাল দিয়ে পানি নিষ্কাশন হতো, আজ প্রভাবশালী মহলের দখলে সে সবের অস্তিত্ব বিলীন প্রায়। সরকার জলাবদ্ধতা নিরসনে বেতনা ও মরিচ্চাপ নদী সহ ৭১টি খাল পুনঃখননে ৪৭৫ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করেছে। কিন্তু বিশাল এই বিনিয়োগের ফলাফল নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ,খনন শেষ হতে না হতেই পলি জমে আবার ভরাট হয়ে যাচ্ছে খাল। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সুফল মিলছে না এই মহাপরিকল্পনার। তবে এর মাঝেও সাতক্ষীরার প্রাণ সায়ের খাল খনন ও দখলমুক্ত করার অভিযান কিছুটা আশার আলো জাগিয়েছে।পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও সচেতন নাগরিকদের মতে,শুধু লোকদেখানো খনন নয়, বরং প্রয়োজন সমন্বিত দীর্ঘ মেয়াদি মহাপরিকল্পনা। তারা বলছেন,দখল হওয়া নদী ও খাল উদ্ধার করে নিয়মিত সংস্কার করতে হবে। স্লুইস গেটগুলোর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। কৃষি, মৎস্য ও নগর পরিকল্পনাকে এক সূত্রে গেঁথে পানি নিষ্কাশন পথ তৈরি করতে হবে। বর্তমান সরকার খাল খননের বড় পরিকল্পনা হাতে নিলেও সাতক্ষীরাবাসী এখন আর কেবল আশ্বাসের ফুল ঝুরি শুনতে চান না। বছরের পর বছর পানির সঙ্গে যুদ্ধ করা এই মানুষেরা এবার দৃশ্যমান ও টেকসই সমাধান দেখতে চান।