বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৩০ পূর্বাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ :
মিথ্যা বিজ্ঞাপন ও অনিয়মে খুলনায় ৯ প্রতিষ্ঠানকে ৫৫ হাজার টাকা জরিমানা টঙ্গীতে স্টেশন রোড সড়ক দখলমুক্ত ও যানজট নিরসনে উচ্ছেদ অভিযান । যাত্রাবাড়ী থানার দনিয়া থেকে প্রাইভেটকার জব্দ ফরিদপুরের ভাঙ্গায় মহাসড়কে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণের ঘটনায় নারীসহ গ্রেফতার-২ ‎বেনাপোল সীমান্তে বিজিবির অভিযানে প্রায় ৩ লাখ টাকার চোরাচালানি পণ্য আটক উত্তরায় লিবার্টি ক্লাবে র‌্যাবের অভিযান – বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি মদ- বিয়ারসহ গ্রেফতার-২ গাজীপুরের টঙ্গীতে পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে পরোয়ানাভুক্ত আসামি ছিনতাইয়ের চেষ্টা গ্রেপ্তার ৫ কাশিয়ানীতে ৩২ লাখ টাকার স্বর্ণালংকার আত্মসাতের অভিযোগ বেনাপোল সীমান্তে ৪৯ বিজিবির অভিযান, মদ-সিরাপসহ বিপুল পণ্য আটক ‎যশোর সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ১৬ লাখ টাকার মাদক ও চোরাচালানি পণ্য আটক ‎ ইয়াবায় ভাসছে তুরাগের ৩৩টি গ্রাম, ১০১ স্পটে শতাধিক ডিলার সক্রিয়

উত্তরার দিয়াবাড়িতে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে প্রায় শতাধিক নার্সারি গড়ে উঠেছে

Reporter Name / ২০ Time View
Update : রবিবার, ২৯ মার্চ, ২০২৬

★★ উত্তরা ১৫ ও ১৬ নম্বর সেক্টরে সারি সারি ছোট-বড় প্রায় শতাধিক নার্সারি
★★ সবুজ সৌন্দর্যকে ঘিরে নার্সারি মানুষের মানসিক শান্তির উৎস হয়ে উঠেছে
★★ ছাদ বাগান উদ্যোক্তা এবং সাধারণ ক্রেতাদের কাছে নার্সারিগুলো নির্ভরযোগ্য ঠিকানা
★★ উত্তরার ডিয়াবাড়ি এখন নার্সারি পাড়া

উত্তরার দিয়াবাড়িতে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে প্রায় শতাধিক নার্সারি গড়ে উঠেছে

মনির হোসেন জীবন, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট : রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে সবুজ রাজ্য খ্যাত ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় শতাধিক নার্সারির ব্যবসা কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। নগরীর প্রাণকেন্দ্রে বহুদিন ধরেই নিরিবিলি পরিবেশের কারণে সর্বস্তরের মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে নার্সারি ব্যবসা । বর্তমানে এ অঞ্চলটি এক বিস্তীর্ণ সবুজ ব্যবসা কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে উত্তরা ১৫ ও ১৬ নম্বর সেক্টরের নদীর পাড় কিংবা উত্তরা মেট্রোরেল স্টেশনে পূর্ব পাশ ঘেঁষে সারি সারি এসব নার্সারির দোকানগুলো গড়ে উঠেছে। বাড়ি- ঘর, অফিস কিংবা ছাদ বাগান সাজাতে পছন্দের গাছ কিনতে প্রতিদিনই রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের জেলা থেকে এখানে ছুটে আসেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ। দিনকে দিন গাছ মানুষের জন্য এক ধরনের মানসিক শান্তির উৎস হয়ে উঠেছে। সবমিলিয়ে ডিয়াবাড়ি এখন নার্সারি পাড়ায় পরিণত হয়েছে। খবর এলাকাবাসি, বৃক্ষ (গাছ) প্রেমিক ও বিশ্বস্ত একাধিক সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

জানা যায়, রাজধানী উত্তরা মডেল টাউনের ১৫ নম্বর সেক্টরের ১১ নম্বর ব্রিজের দক্ষিণ পাশে রাস্তার দুই ধারে তাকালেই চোখে পড়ে সারি সারি সাজানো নামে বেনামে অসংখ্য এসব নার্সারি। যেন সবুজের দীর্ঘ কারুকাজ বিছিয়ে আছে পুরো পথজুড়ে। ব্রিজের উত্তর পাশেও আছে আরও কিছু নার্সারি। ছোট-বড় সব মিলিয়ে ডিয়াবাড়ি, মেট্রোরেল প্রকল্প ও উত্তরা এ্যাপার্টমেন্ট এর রাস্তার পাশে অন্তত প্রায় শতাধিক নার্সারির দোকান রয়েছে। যা এই এলাকার সবুজ সৌন্দর্যকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে তোলেছে। দূর থেকে তাকালেই দেখা যায়, গাছের রং, পাতার নানান আকার ও ফুলের দারুণ রঙে পুরো জায়গাটি অন্যরকম দৃশ্যে পরিণত হয়েছে। পথচারীরা হাঁটতে হাঁটতেই থেমে যান, কেউ গন্ধ শোঁকে, কেউ নতুন চারা দেখেন, কেউ শুধু সবুজের সারি দেখে মন ভরে ফেরেন। রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি উন্নয়ন প্রকল্প, ছাদ বাগান উদ্যোক্তা এবং সাধারণ ক্রেতাদের কাছে এখন দিয়াবাড়ির নার্সারি গুলো রাজধানীর অন্যতম নির্ভরযোগ্য ঠিকানা।

আজ শনিবার (২৮ মার্চ) বিকেলে উত্তরা- তুরাগের দিয়াবাড়িতে গড়ে উঠা নার্সারিগুলো সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, উত্তরা মডেল টাউনের ১৫, ১৬ নম্বর সেক্টরের ১১/২ নম্বর ব্রিজের দক্ষিণ পাশ, উত্তরা লেক এবং উত্তরা এ্যাপার্টমেন্ট এর রাস্তার পাশে সরকারি খালি প্লট ও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এর পরিত্যক্ত জায়গায় এসব সারিসারি নার্সারির দোকানগুলো গড়ে তোলা হয়েছে। রাস্তার দুই পাশে কোথাও ফলের বড় চারা, কোথাও সারিবদ্ধ ইনডোর প্ল্যান্ট, আবার কোথাও দেশি-বিদেশি ফুল ও ফলের গাছের সারি। শোভাবর্ধক ও ওষুধি গাছও আছে। গাছের এই বৈচিত্র্যই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। এককথায়, এখানে প্রায় সব ধরনের চারা ও গাছই পাওয়া যায়। দোকানী তথা গাছ ব্যবসায়ীরা এ প্রতিবেদককে জানান, বর্ষাকালে যেখানে ফল ও বনজ চারা বেচাকেনা বেশি হয়; সেখানে শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই নার্সারিগুলোর পরিবেশ পুরোপুরি বদলে গেছে। ব্যবসায়ীরা হয়ে ওঠেছেন আরও ব্যস্ত। মালিক-শ্রমিকদের যেন দম ফেলার সুযোগ নেই। বর্তমানে সেখানে চোখে পড়ে ছুটোছুটি ও ব্যস্ততার চিত্র। কারণ নভেম্বরে শুরু হয় শীতকালীন ফুলের চারার গুরুত্বপূর্ণ মৌসুম। গাঁদা, বেগুনি, ক্যালেন্ডুলা, কসমস, জারবেরা, পিটুনিয়া—এসব ফুলের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। তাই শীতকালীন ফুলের বীজতলা তৈরি, চারা বাছাই, মাটি তৈরি, টব প্রস্তুত এবং গাছের পরিচর্যাসহ নার্সারির নানা কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকেরা। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত চলে তাদের এই কার্যক্রম। সবমিলিয়ে নার্সারি পাড়া হয়ে ওঠেছে এক জীবন্ত সবুজ কর্মশালা। প্রতিটি নার্সারিতে ৩ থেকে ৫ জন স্থায়ী শ্রমিক নিয়মিত কাজ করেন। সিজনভেদে ও কাজের চাপ অনুযায়ী অতিরিক্ত দৈনিক ও মাসিক মজুরির শ্রমিকও নেওয়া হয়। পুরুষের পাশাপাশি নারী শ্রমিকদেরও নার্সারি কাজ করতে দেখা যায়।

ডিয়াবাড়িতে একাধিক নার্সারি ঘুরে এবং শ্রমিকদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, এই নার্সারি পাড়ায় গাছের পাশাপাশি আছে মিশ্র মাটি, ড্রাম, টব, হ্যাঙ্গিং বাসকেট, জিআই স্ট্যান্ড, জৈব সার, কীটনাশক, স্প্রে বটলসহ বাগানের প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম। ফলে ক্রেতারা সহজেই এক জায়গা থেকেই সবকিছু সংগ্রহ করতে পারেন। সালাম ও ইমরান হাসান নামে দুই শ্রমিক বীজতলায় পানি দিতে দিতে দৈনিক জনতাকে বলেন, গত ৩/৪ বছর থেকেই তিনি এখানকার নার্সারিতে কাজ করছেন। থাকা মালিকের, খাওয়া নিজের। মাসিক বেতন ১৮ হাজার টাকা। তবে কেউ গাছ কিনতে আসলে গাড়িতে উঠিয়ে দিলে স্যাররা খুশি হয়ে মাঝে মধ্যে বখশিশ দেয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাগানের কর্মচারী এ প্রতিবেদককে বলেন, ‌বীজতলা তৈরি, চারা রোপণ, পানি দেওয়া, সার মেশানো ও বিক্রি —সবই সময় মতো করতে হয়। শীতকালে ফুল গাছের চাহিদা অন্য সকল মাসের চেয়ে অনেক বেশি থাকে। তাই ফুলসহ শীতকালীন শাক-সবজির চারা তৈরিতে শীতের শুরু থেকেই আমাদের কাজের চাপ বাড়তে থাকে। প্রতিটি নার্সারির শ্রমিকেরা ভোর থেকে রাত ৮/৯ পর্যন্ত কাজ করেন। এখন ভালোভাবে চারা তৈরি করে শীতের মৌসুম ধরতে পারলে নার্সারির বাজারও জমজমাট হবে বলে জানান ডিয়াবাড়ি এলাকার নার্সারির শ্রমিকরা। এছাড়া উত্তরা মেট্রোরেল এলাকার ৭৯ নম্বর পিলারের পাশে এক শ্রমিকের সাথে কথোপকথন হলে তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, দীর্ঘদিন ধরেই তিনি নার্সারি শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। বীজতলা ও গাছে নিয়মিত কয়েক বেলায় পানি দিই। কোনো পাতা বা কাণ্ড নষ্ট হলে সঙ্গে সঙ্গেই সেটার ব্যবস্থা নেই। এছাড়া এখানে শাক-সবজি, ফুল, ফল, গাছ পালা সবই হচ্ছে। এতে করে নার্সারিগুলোর বড় একটি ক্রেতা গোষ্ঠী নগরবাসীর জন্য তৈরি হয়েছে।

ডিয়াবাড়ি এলাকার একাধিক নার্সারি মালিকদের সঙ্গে কথা হলে তারা এ প্রতিবেদককে জানায়, তাদের ৪০-৫০ শতাংশ ক্রেতাই এখন ছাদ বাগান চর্চাকারী। তারা শুধু গাছই নয়; বেড তৈরি, টবে মাটি মেশানো, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, ছাদ বাগান তৈরির ডিজাইন, কীটনাশক ব্যবস্থাপনা—সবই নার্সারি থেকে সেবা হিসেবে নিচ্ছেন। মালিকরা বলেন, অনেকেই শুরুতে জানেন না কোন গাছ কোথায় বসবে। আমরা পুরো ছাদের প্ল্যান সাজিয়ে দিই। তাই ছাদ বাগানকারীরা এখন আমাদের সবচেয়ে বড় ক্রেতা।
তারা আরও বলেন, ঢাকার ব্যস্ত মানুষের কাছে এই রেডিমেড সেবা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। শুধু ছাদ নয়, বারান্দা, অফিসের রিসেপশন, রেস্তোরাঁর ডেকোরেশন—সব জায়গায়ই নার্সারির চাহিদা বাড়ছে।

ব্যবসায়ীদের মতে- প্রতিদিনই রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের জেলা থেকে বাড়ি-ঘর, অফিস, রেস্তোরাঁ এবং ছাদ বাগান সাজাতে পছন্দের গাছ কেনার জন্য ভিড় জমে ওঠে উত্তরা- তুরাগের দিয়াবাড়ির নার্সারি পাড়ায়। কেউ আসেন নতুন বাগান শুরু করতে, কেউ আসেন পুরোনো বাগানে নতুন গাছ যোগ করতে। পরিবার, তরুণ-তরুণী, বাগান উদ্যোক্তা, করপোরেট প্রতিনিধির পদচারণায় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জমজমাট থাকে এই সবুজ বাজার। উত্তরাতে নামে বেনামে অসংখ্য নার্সারি গড়ে উঠেছে। ক্রেতারা তাদের পছন্দ মতো প্রয়োজনীয় ফুল, ফল ও শোভাবর্ধক গাছ সংগ্রহ করতে পারছেন। আম, মাল্টা, লেবুসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জাতের ফলের গাছ রয়েছে। এখানে অনেক নার্সারি থাকায় ভালো গাছ বেছে নেওয়ার সুযোগ আছে । শুধু গাছ নয়—টব, প্রস্তুত মাটি, ড্রেনেজ উপাদান, জৈব সারসহ বিভিন্ন বাগানসামগ্রীও রয়েছে।

তুরাগ ও উত্তরা এলাকার বাসিন্দারা এ প্রতিবেদককে বলেন, দিয়াবাড়ি শুধু ব্যবসার কেন্দ্র নয়; এটি নগরের সবুজায়নের এক প্রধান উৎস। বিভিন্ন সরকারি- বেসরকারি প্রকল্প, সড়ক উন্নয়ন, স্কুল- কলেজ, অফিস, শপিং মল, পার্ক—বেশিরভাগ জায়গায় ব্যবহৃত গাছ এখান থেকেই যায়। ঢাকার সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায়ও নার্সারিগুলো গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। প্রতিটি গাছ বাতাস শুদ্ধ করছে, তাপমাত্রা কমাচ্ছে, পাখিদের আশ্রয় দিচ্ছে। এভাবেই দিয়াবাড়ির শতাধিক নার্সারি ব্যবসার পাশাপাশি শহরের বুকে গড়ে তুলেছে এক অনন্য সবুজ রাজ্য। শহরের ভিড়, ধুলো থেকে মুক্ত হয়ে সবুজের ছোঁয়া পেতে এবং মানসিক প্রশান্তির খোঁজে ছুটির দিন বহু মানুষ ছুটে আসেন এখানে। নগরজীবন এখন চাপ, ক্লান্তি ও মানসিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে চলছে। তাই গাছ মানুষের জন্য এক ধরনের মানসিক শান্তির উৎস হয়ে উঠেছে।

সংশ্লিষ্টরা ও সচেতন মহলের দাবি- স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ ও বসবাসযোগ্য নগরী গড়ে তুলতে হলে বেশি করে নগরজুড়ে বৃক্ষরোপনের পাশাপাশি বনায়ন গড়ে তুলতে হবে। প্রকৃতি ও পরিবেশগত সংবেদনশীলতার বিকাশ ঘটিয়ে নগরবাসীকে জনসচেতনতার সৃষ্টি করতে হবে। এজন্য সরকারকে যথাযথ বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলেই আরও একধাপ এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। এমন প্রত্যাশা নগরবাসির।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Theme Created By ThemesDealer.Com