মিহিরুজ্জামান সাতক্ষীরাঃ
সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলে চলতি বোরো মৌসুমে ধান আবাদ লক্ষ্য মাত্রা ছাড়িয়ে গেলেও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এবং বাজারে ধানের দামে ধস এই দুই চাপে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। ফলে একদিকে,রেকর্ড উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হলেও অন্যদিকে,উৎপাদন খরচ ও কম দামের কারণে লোকসানের আশঙ্কা বাড়ছে কৃষক পর্যায়ে।
জেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে,চলতি মৌসুমে ৮০ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদের লক্ষ্য মাত্রা নির্ধারণ করা হলেও আবাদ হয়েছে ৮২ হাজার ৭৩৫ হেক্টর জমিতে। অতিরিক্ত আবাদ মূলত ঘের এলাকার সম্প্রসারণের মাধ্যমে হয়েছে। সাতক্ষীরা আশাশুনি প্রতাপনগর সহ বিভিন্ন এলাকায় এই অতিরিক্ত চাষাবাদ লক্ষ্য করা গেছে। তবে মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের অভিযোগ,উৎপাদন ভালো হলেও সেচ,জ্বালানি ও বাজারদরের অস্থিরতায় লাভের হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। সাতক্ষীরা সদর উপজেলার রইচপুর গ্রামের কৃষক আমিনুল ইসলাম বলেন,জমিতে ঠিক মতো পানি না দিলে ধান ভালো হয় না। কিন্তু বিদ্যুৎ ঠিক মতো পাওয়া যায় না, আবার ডিজেলও ঠিক মতো পাওয়া যাচ্ছে না। লাইনে দাঁড়িয়ে কম জ্বালানি নিতে হচ্ছে,অনেক জায়গায় আবার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন,সারা দিন একটু করে কারেন্ট দেয়,আবার বন্ধ হয়ে যায়। এতে সেচ ঠিক মতো দেওয়া যায় না। ৪০ বছর ধরে চাষ করি,কিন্তু এখন সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছি। মন্টু মিয়ার বাগানবাড়ি এলাকার কৃষক লিটন বাবু বলেন,লোড শেডিংয়ের কারণে ঠিক মতো পানি তুলতে পারছি না। রাতে পানি তুলতে গেলে অনেক সময় বিদ্যুৎ থাকে না। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সেচ আরও কঠিন হয়ে গেছে। সাতক্ষীরার খড়িবিলা এলাকার কৃষক শরিফুল ইসলাম বলেন,আমি ১১ বিঘা জমিতে ধান চাষ করি। কিন্তু এ বছর খরচের তুলনায় দাম একে বারেই কম। প্রতি বিঘায় রোপণ খরচ প্রায় ২৫০০ টাকা,সার,বিদ্যুৎ বিল,ঘাস পরিষ্কার ও শ্রমিক খরচ মিলিয়ে লাভ তো দূরের কথা,কোনো মতে সমান থাকবে। তিনি আরও বলেন,এক বিঘা জমির লিজ দিতে লাগে ২০ হাজার টাকা। আমার ১১ বিঘায় শুধু লিজ বাবদই প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। সব খরচ বাদ দিলে কোনো লাভ থাকবে না।
কৃষকদের অভিযোগ,গত বছর যেখানে প্রতি বস্তা ধান ২৩০০ থেকে ২৪০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, সেখানে এবার তা নেমে এসেছে ১৬০০ থেকে ১৭০০ টাকায়। এতে উৎপাদন খরচই তুলতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। তাদের দাবি,সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা,জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং ধানের ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ না হলে ভবিষ্যতে অনেক কৃষক চাষাবাদ থেকে সরে যেতে বাধ্য হবেন।
অন্য দিকে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো.সাইফুল ইসলাম বলেন, সাতক্ষীরা একটি খাদ্য উদ্বৃত্ত জেলা। এখানে আউশ, আমন ও বোরো এই তিন মৌসুমেই ধান উৎপাদন হয়। এ বছর ফসল অত্যন্ত ভালো হয়েছে। আমরা যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিলাম,তার চেয়েও বেশি জমিতে আবাদ হয়েছে। আমরা আশা করছি, সামগ্রিক উৎপাদনও ভালো হবে। তিনি আরও বলেন,তেল ও জ্বালানি সংকটের যে কথা বলা হচ্ছে, বাস্তবে এর তেমন বড় প্রভাব পড়বে না। কারণ ৫ থেকে ৬ দিনের বৃষ্টিপাত হয়েছে,যা অনেক এলাকায় সেচের চাপ কমিয়েছে। যেসব এলাকায় সমস্যা রয়েছে,সেখানে আমাদের কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত ভাবে মাঠে কাজ করছেন।